ঢাকা উত্তর সিটির কাউন্সিলর রাজীবকে ১৪ দিনের রিমান্ডে

প্রকাশিত: 10:03 AM, October 21, 2019

নিজস্ব প্রতিবেদক: মাদক ও অস্ত্র আইনের মামলায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীবের ১৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। রোববার তাকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে ভাটারা থানার মাদক মামলায় ১০ দিন ও অস্ত্র আইনে করা মামলায় ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। পরে শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম বেগম ইয়াসমিন আরা মাদক মামলায় সাত দিন ও অস্ত্র মামলায় সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এর আগে রোববার রাতে তাকে ভাটারা থানায় হস্তান্তর করা হয়। তার বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র আইনে মামলা করেন র‌্যাব-১ এর ডিএডি মিজানুর রহমান।

এর আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীবকে চলমান শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে গত শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর বারিধারা এলাকার একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে র‌্যাব সদস্যরা গ্রেফতার করেন। পরে তাকে নিয়ে ওই রাতেই একাধিক স্থানে অভিযান চালানো হয়।

জানা গেছে, কাউন্সিলর রাজীবের বাবার নাম তোতা মিয়া। তিনি পেশায় রাজমিস্ত্রী। রাজীব কাউন্সিলর হওয়ার পর প্রভাব খাটিয়ে তিনি এবং তার স্বজনরা বিপুল পরিমাণ টাকা কামিয়েছেন। তার চাচা ইয়াসিন হাওলাদার মোহাম্মদপুর এলাকায় দখল করেছেন একাধিক প্লট। আর তিনি হয়েছেন কোটি কোটি টাকার মালিক।

আরও জানা গেছে, মোহাম্মদপুরে যুবলীগ দিয়ে শুরু রাজীবের রাজনৈতিক জীবন। মাত্র এক বছর রাজনীতি করেই বাগিয়ে নেন মোহাম্মদপুর থানা যুবলীগের যুগ্ম-আহ্বায়কের পদ। এ পদ পাওয়ার পরই ক্ষমতা দেখানো শুরু হয় রাজীবের। থানা আওয়ামী লীগের এক নেতা মুক্তিযোদ্ধাকে প্রকাশ্যে জুতাপেটা করেন রাজীব। যে কারণে যুবলীগ থেকে তাকে বহিষ্কারও করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, রাজীব মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বহিষ্কারাদেশ বাতিল করে উল্টো ঢাকা মহানগরী উত্তর যুবলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক বনে যান। কেন্দ্রীয় যুবলীগের আলোচিত দফতর সম্পাদক আনিসুর রহমানকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা দিয়ে এ পদ কেনেন রাজীব। খুব অল্প সময়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হন রাজীব।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ, চন্দ্রিমা হাউজিং, সাতমসজিদ হাউজিং, ঢাকা উদ্যানসহ বিভিন্ন এলাকায় দখলবাজি ও চাঁদাবাজি করেই এই অর্থ বৈভবের মালিক হন তিনি। মোহাম্মদপুর এলাকায় তার একাধিক বাড়ি, জমি আছে ও একাধিক বিলাসী গাড়ির মালিক তিনি। ২০১৫ সালের কাউন্সিলর নির্বাচনে তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। বিভিন্ন কারসাজি করে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট নেতা ঢাকা মহানগরী উত্তর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি শেখ বজলুর রহমানকে হারান। এর পর তাকে আর ফিছে ফিরতে হয়নি। এক দশক আগে মোহাম্মদীয়া হাউজিংয়ে ছোট্ট বাসায় পরিবার নিয়ে থাকলেও এখন থাকেন ডুপ্লেক্স বাড়িতে। চলেন দামি গাড়িতে।

রহিম ব্যাপারী ঘাট মসজিদের সামনে আবদুল হক নামে এক ব্যক্তির ৩৫ কাঠার একটি প্লট যুবলীগের কার্যালয়ের নামে দখল, ওই জমির পাশেই জাকির হোসেনের ৭-৮ কাঠার ১টি প্লট দখল করেছিলেন রাজীব। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের পাশে ময়ূর ভিলার মালিক রফিক মিয়ার কয়েক কোটি টাকা দামের জমি দখল করেন তিনি। পাবলিক টয়লেট নির্মাণের মাধ্যমে জমিটি দখল করলেও সেখানে ৫টি দোকান তুলে ভাড়া দিয়েছেন। ঢাকা রিয়েল এস্টেটের ৩ নম্বর সড়কের ৫৬ নম্বর প্লট, চাঁদ উদ্যানের ৩ নম্বর সড়কের রহিমা আক্তার রাহি, বাবুল ও জসিমের ৩টি প্লটসহ অন্তত ১০টি প্লট দখল করেছেন তিনি। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের সামনে আল্লাহ করিম মসজিদ ও মার্কেটের নিয়ন্ত্রণও রাজীবের হাতে।

অভিযোগ রয়েছে, মোহাম্মদপুর, বেড়িবাঁধ, বসিলার পরিবহনে চাঁদাবাজি রাজীবের নিয়ন্ত্রণে। অটোরিকশা, লেগুনা, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও বাস থেকে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকা চাঁদা তোলে তার লোকজন। পাঁচ বছর ধরে এলাকার কোরবানির পশুর হাটের ইজারাও নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন রাজীব। তার রয়েছে নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী। সবসময় চলাফেরা করতেন গাড়ির বহর নিয়ে।

অভিযোগ রয়েছে, মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির ১ নম্বর সড়কের ৩৩ নম্বর প্লটে তিনি বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি করেন। এলাকার অনেকে বলছেন ৫ কাঠা জমির ওপর ওই বাড়ি তৈরি করতে ৫-৬ কোটি টাকার ওপর খরচ করেন তিনি।

কিছুদিন পরপরই তিনি পরিবর্তন করেন গাড়ির ব্র্যান্ড। যেখানেই যান, তার গাড়িবহরের সামনে-পেছনে থাকে শতাধিক সহযোগীর একটি দল। নিজের সংগ্রহে রয়েছে মার্সিডিস, বিএমডব্লিউ, ক্রাউন প্রাডো, ল্যান্ডক্রুজার ভি-৮, বিএমডব্লিউ স্পোর্টসসহ নামিদামি সব ব্র্যান্ডের গাড়ি।

রাজীবের সব অপকর্মের সঙ্গী যুবলীগ নেতা শাহ আলম জীবন, সিএনজি কামাল, আশিকুজ্জামান রনি, ফারুক, রাজীবের স্ত্রীর বড় ভাই ইমতিহান হোসেন ইমতিসহ অর্ধশত ক্যাডার। অভিযোগ রয়েছে, রাজীবের নির্দেশেই যুবলীগ কর্মী তছিরকে হত্যা করে রাজীবের ঘনিষ্ঠরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাউন্সিলর নির্বাচন করার আগে রাজনীতির পাশাপাশি এক চাচাকে কাজকর্মে সহযোগিতা করতেন। ওই চাচা ঠিকাদারি করতেন। নির্বাচনের সময় তার ওই চাচা একটি জমি বিক্রি করে ৮০ লাখ টাকা দিয়ে তাকে কাউন্সিলর নির্বাচন করতে সহযোগিতা করেন। ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় এখন ওই চাচার সঙ্গেও যোগাযোগ নেই।

দল থেকে বহিষ্কার
র‌্যাবের হাতে আটক ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজীবকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ গণমাধ্যমকে তার বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। হারুনুর রশিদ বলেন, চলমান অভিযানে যুবলীগের কেউ দুর্নীতি বা অন্য কোনো কারণে গ্রেফতার হলে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের ঘোষণা ছিল আমাদের। সেই মোতাবেক রাজীবকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দল থেকে বহিষ্কার হলেও রাজীব এখনো ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে বহাল আছেন।