সড়ক পরিবহন আইন প্রস্তুতি ছাড়া কার্যকর

প্রকাশিত: 9:55 AM, November 2, 2019

জাগ্রত বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক:বিশৃঙ্খল সড়ক খাতকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে শুক্রবার থেকে চালু হয়েছে নতুন আইন। এতে রাখা হয়েছে কারাদণ্ড থেকে শুরু করে বড় অংকের অর্থ জরিমানার বিধানও। কিন্তু ‘হুট করে চাপিয়ে দেওয়া’ আইনটির জন্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক, যাত্রী, ব্যক্তিগত এবং ভাড়ায় চালানো গাড়ির চালকরা কতটুকু প্রস্তুত- প্রশ্ন উঠে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে চালক থেকে শুরু করে যাত্রীকেও পরিবর্তিত আইনের সঙ্গে পরিচিত করানোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। রাস্তার ধারণক্ষমতা থেকে শুরু করে যানজট নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিয়ে এই আইন সত্যিকার অর্থে কতটুকু ফলপ্রসূ হবে তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেকেই। মালিক চালক যাত্রী ট্রাফিক সরকার সবাই যেন ঘুরপাক খাচ্ছে নতুনের চক্রে। সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের ধোঁয়াশা।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন গতকাল খোলা কাগজকে বলেন, ‘চালকসহ সাধারণ মানুষ নতুন সড়ক আইন সম্বন্ধে বিস্তারিত জেনে-বুঝে ওঠার আগেই কার্যকর হয়েছে। বিষয়টি সবাইকে জানাতে ব্যাপক প্রচারণা চালানো দরকার। প্রয়োজনীয় প্রচারণা চালানো না হলে সংশ্লিষ্টরা অবগত হবে না। মানুষ যদি না জানে, বিষয়টা হবে বিব্রতকর।’

নিসচা চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘সরকারকে বলব, প্রত্যেক প্রচারমাধ্যমে প্রজ্ঞাপন জারির ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। আইন সম্পর্কে পিলার হিসেবে পত্রিকা এবং টেলিভিশনগুলোতে যেন প্রতিদিনই প্রচারিত হয়। অন্তত ছয় মাস আইনটি প্রচার-প্রচারণার মধ্যে থাকুক। তাহলে কার্যকর হবে।’

গণপরিবহন বিশেষজ্ঞসহ সাধারণ মানুষও বলছেন, হুট করে কোনো কিছু প্রতিষ্ঠিত হয় না, রাতারাতি পরিবর্তনও অসম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন প্রস্তুতি এবং জনমানুষকে সম্পৃক্ত করা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর দক্ষতাসহ আনুষঙ্গিক বিষয়ে বাস্তব জ্ঞানও জরুরি।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী খোলা কাগজকে বলেন, ‘পরিবহন খাত বিশাল সেক্টর। এই সেক্টরের জন্য সবকিছু ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ থাকবে বিধিতে। কিন্তু আইনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এখন পর্যন্ত বিধি প্রণয়ন করা হয়নি। এতে আইনের অপব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। বিস্তারিত ব্যাখ্যা না থাকার কারণে অপব্যবহার হতে পারে। সার্বিক মূল্যায়নে এটা প্রকৃতপক্ষে মালিক-শ্রমিকের স্বার্থের দলিল। এখানে জনসাধারণের বা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়নি। সেই কারণে এটাকে মালিকদের দাবি-দাওয়ার দলিল হিসেবে আখ্যায়িত করছি আমরা।’

তিনি আরও বলেন, ‘জনসাধারণের স্বার্থ সংরক্ষণের সুযোগ থাকে না বলে মালিকরা একচেটিয়া সুযোগ পেয়ে যায়। এই আইনে যাত্রী সাধারণের কোনো প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়নি। বিগত সময়ে পরিবহনে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা প্রত্যক্ষ করেছি। সরকার বিভিন্ন সময়ে চেষ্টা করেও শৃঙ্খলা ফেরাতে পারেনি। ফলে নতুন আইনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল। এতে যাত্রী সাধারণের প্রতিনিধিত্ব নেই। রাস্তাঘাটে নিত্যদিনের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।’

মোজাম্মেল বলেন, ‘সড়ক সংশ্লিষ্ট যে সমস্ত ফোরাম সমাধানের জন্য আছে; এখানে মালিক-শ্রমিক সরকার থাকে, জনসাধারণের প্রতিনিধিত্ব থাকে না। বিশাল যাত্রীসমাজের প্রতিনিধিত্ব থাকে না বলে তাদের পক্ষে কোনো সিদ্ধান্ত হয় না। তার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ, সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী ও শ্রমিক নেতা শাজাহান খানের নেতৃত্বে ১১১ দফার সুপারিশ প্রণয়ন। বিশ্লেষণ করে দেখলাম, যাত্রী সমিতি না থাকার কারণে এটি একচেটিয়া হয়ে গেছে। পরিবহন খাতের বড় সমস্যা ভাড়া নৈরাজ্য। এর কোনো সুপারিশ এখানে আসেনি। চালকদের বেতন এবং কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না করার কারণে আজকে বাসে বাসে যে ভয়ঙ্কর প্রতিযোগিতা- সেটাই দুর্ঘটনার প্রধানতম কারণ। সেই সুপারিশও ১১১ দফায় নেই।’

যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারি, জনসাধারণের প্রতিনিধি না থাকলে স্বার্থসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলো সরকারি ফোরামে উপেক্ষিত। ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে যাত্রী সাধারণের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় বারগেইনিংয়েরও সুযোগ নেই। মালিক-শ্রমিকরা ভাড়া নির্ধারণ করবে, তারাই জোর করে আদায় করবে। বৃহত্তর জনসাধারণ অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।’

সড়ক আইনের কার্যকারিতা সম্বন্ধে তিনি বলেন, ‘এই আইন সম্বন্ধে জনসাধারণকে অবহিত করা সরকারের দায়িত্ব। সবাই যাতে ধারণা লাভ করতে পারে। রাস্তায় নামলাম, মোবাইল ফোনে কথা বললাম- আগে দিতে হতো ২০০, এখন দিতে হবে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা! তাহলে আমাকে তো পাঁচ হাজার টাকা পকেটে নিয়েই রাস্তায় নামতে হবে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে দশ হাজার টাকা জরিমানা। এই টাকা পকেটে নিয়েই যেতে হবে! প্রস্তুতির একটা বিষয় আছে।’

গণপরিবহনের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় কাজ করা এই নেতা বলেন, ‘জনগণ যে আইন সম্বন্ধে যত বেশি জানবে তত বেশি মানবে। সরকার এই আইন প্রায় ১৪ মাস আগে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। তার এক মাস পরে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। গেজেটের ১৩ মাস পরও সরকারের পক্ষ থেকে জনসাধারণকে জানানোর জন্য যে মাধ্যমগুলো আছে, কোনোটিতেই প্রচারণার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আজ টেলিভিশনে লাইভে দেখেছি, নিজেও যখন বাসে উঠেছি- ক’জনের সঙ্গে আলোচনা করেছি। কেউই জানে আইন কার্যকরের কথা! গণমাধ্যমের সঙ্গে অনেকের সম্পৃক্ততা নেই; পত্রিকা পড়েন না, টেলিভিশন দেখেন না এমন মানুষ অসংখ্য।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন সড়ক আইন কার্যকর হলেও প্রয়োগ ঘটবে পুরনো আইনেই। ফলে শেষ পর্যন্ত কতটুকু সুফল দেবে তা নিয়েও রয়েছে আশঙ্কার দোলাচল। বেশিরভাগ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তির কথা থাকলেও উল্লেখ নেই সর্বনিম্ন শাস্তির। দায়ী চালকের সর্বোচ্চ সাজা ৫ বছর সাজার বিধান রাখা হয়েছে। জামিন হবে না আসামির। রয়েছে যানবাহন মালিকের দণ্ডের বিষয়ও। সংকেত না মানলে জেল-জরিমানার মুখোমুখি হবেন যাত্রী-পথচারীরাও। ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারেও রয়েছে নির্দেশনা।

এতদিন যাত্রী-পথচারী আইনের আওতার বাইরে থাকলেও ‘অনিয়মকে নিয়ম বানানো’ সংশ্লিষ্টরা ভোগান্তিতে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশাল সংখ্যক যাত্রী ও গণপরিবহনকে দেখভালের জন্য পর্যাপ্ত ট্রাফিক সিস্টেম রয়েছে কিনা, লোকবলের অভাবে এটির লেজেগোবরে দশায় পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। এই আইনের কার্যকারিতা ও প্রায়োগিক বিষয়ে সরকারও অপেক্ষায় রয়েছে। ইতি-নেতি বিবেচনায় পরে আবার তা সংশোধিত রূপ পেতে পারে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেই ট্রাফিক পুলিশেরও।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে শুধু টাকার পরিমাণ ও কারাদণ্ডের সময় বাড়ানো হয়েছে। পুরনো সড়ক আইনের সঙ্গে তেমন কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। সংশ্লিষ্টদের ‘অপ্রস্তুত’ অবস্থায় আইন কতটা ইতিবাচক পরিবর্তনের হাতিয়ার হবে তা বোঝা যাবে অল্প কিছুদিন পরেই।